০২:৩৮ পূর্বাহ্ন, সোমবার, ২৫ মে ২০২৬, ১০ জ্যৈষ্ঠ ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

টেন্ডার কারসাজি ও কমিশন সিন্ডিকেট

গণপূর্তের প্রকৌশলী শামছুদ্দোহার ‘ঘুষ রাজত্ব’

নিজস্ব প্রতিবেদক,ঢাকা
  • আপডেট সময় : ০১:১৬:২০ পূর্বাহ্ন, সোমবার, ২৫ মে ২০২৬ ১১ বার পড়া হয়েছে

গণপূর্ত অধিদপ্তরের অতিরিক্ত প্রধান প্রকৌশলী মো. শামছুদ্দোহা পিআরএল (অবসরোত্তর ছুটি)-কে সামনে রেখে বেপরোয়া হয়ে উঠেছেন। তাঁর বিরুদ্ধে ব্যাপক আর্থিক অনিয়ম, কমিশন বাণিজ্য ও টেন্ডার কারসাজির অভিযোগ উঠেছে।

দীর্ঘদিন ধরে তিনি একটি শক্তিশালী সিন্ডিকেট গড়ে তুলে অধিদপ্তরের বিভিন্ন উন্নয়ন প্রকল্পে একচ্ছত্র প্রভাব বিস্তার করে আসছেন।

অধিদপ্তরের একাধিক সূত্র জানায়, বিসিএস পাবলিক ওয়ার্কস ইঞ্জিনিয়ার্স অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি হওয়ায় তাঁর বিরুদ্ধে সাধারণ কর্মকর্তা-কর্মচারীরা প্রকাশ্যে কথা বলতেও সাহস পান না।

অভিযোগ রয়েছে, তাঁর নেতৃত্বে গড়ে ওঠা সিন্ডিকেটের মাধ্যমে বিভিন্ন প্রকল্পের টেন্ডার, বাজেট বণ্টন ও অনুমোদন প্রক্রিয়ায় অনিয়ম করে বিপুল পরিমাণ অর্থ হাতিয়ে নেওয়া হচ্ছে।

সূত্রগুলো বলছে, শামছুদ্দোহার ‘চাহিদামাফিক কমিশন’ না দিলে অনেক কর্মকর্তা গুরুত্বপূর্ণ কাজ বা প্রকল্প থেকে বঞ্চিত হন। এতে সাধারণ ও নিরীহ কর্মকর্তারা চরম চাপের মুখে রয়েছেন।

অভিযোগ রয়েছে, সাভার সার্কেলের তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলীর দায়িত্বে থাকাকালে বড় বড় সরকারি আবাসন প্রকল্পের দরপত্রে অনিয়ম সংঘটিত হয়। এছাড়া ময়মনসিংহ জোনে দায়িত্ব পালনকালে মডেল মসজিদ প্রকল্পসহ বিভিন্ন উন্নয়ন কাজের এপিপি (APP) বরাদ্দ ও প্রাক্কলন অনুমোদনে দুর্নীতির আশ্রয় নেওয়ার অভিযোগও উঠেছে। সংশ্লিষ্টদের দাবি, নির্দিষ্ট ঠিকাদার গোষ্ঠীকে সুবিধা দিতে এলটিএমের (LTM) পরিবর্তে ওটিএম (OTM) পদ্ধতিতে দরপত্র আহ্বান করে অনিয়ম করা হয়েছে। এর মাধ্যমে প্রতিযোগিতা সীমিত করে পছন্দের ঠিকাদারদের কাজ পাইয়ে দেওয়া হতো।

অনুসন্ধানে জানা যায়, দুর্নীতির মাধ্যমে অর্জিত অর্থে রাজধানীর গুলশান, বনানী, উত্তরা, মিরপুর, বসুন্ধরা ও বারিধারায় একাধিক ফ্ল্যাটের মালিক হয়েছেন শামছুদ্দোহা। এ ছাড়া জামালপুরের সরিষাবাড়ীতে তাঁর আলিশান বাড়ি ও রিসোর্ট নির্মাণের জন্য বিপুল পরিমাণ জমি রয়েছে বলেও জানা গেছে। অভিযোগ রয়েছে, দেশে অর্জিত অর্থের একটি অংশ বিদেশেও পাচার করে সেখানে নামে-বেনামে সম্পদ গড়ে তুলেছেন।

সংশ্লিষ্ট সূত্র মতে, ছাত্রজীবনে আনন্দ মোহন কলেজ ও বুয়েট ছাত্রলীগের রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত ছিলেন শামছুদ্দোহা। এ ছাড়া সাবেক প্রধান প্রকৌশলী হাফিজুর রহমান মুন্সীর আত্মীয় হওয়ায় দীর্ঘদিন ধরে তিনি গুরুত্বপূর্ণ পদে বহাল রয়েছেন। অভিযোগ রয়েছে, রাজনৈতিক প্রভাব ব্যবহার করে তিনি অতীতের বিভিন্ন অভিযোগ ধামাচাপা দিতে সক্ষম হন। সম্প্রতি প্রধান প্রকৌশলীর চলতি দায়িত্ব পেতে সরকারের উচ্চপর্যায়ে তদবির চালিয়েও ব্যর্থ হন তিনি।

এ ছাড়াও অধিদপ্তরের ভেতরে নারী কেলেঙ্কারিসহ নানা অনৈতিক কর্মকাণ্ড নিয়েও আলোচনা রয়েছে বলে দাবি করেছেন একাধিক কর্মকর্তা। তাঁর প্রভাবের কারণে অনেকেই প্রকাশ্যে মুখ খুলতে ভয় পান।

সাধারণ কর্মকর্তা-কর্মচারীদের দাবি, গণপূর্ত অধিদপ্তরে স্বচ্ছতা ফিরিয়ে আনতে শামছুদ্দোহার বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগগুলো দ্রুত তদন্ত করতে সংশ্লিষ্ট ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের আশু হস্তক্ষেপ প্রয়োজন।

এসব অভিযোগের বিষয়ে মুঠোফোনে গণপূর্ত অধিদপ্তরের অতিরিক্ত প্রধান প্রকৌশলী মো. শামছুদ্দোহা”র সঙ্গে মুঠোফোনে যোগাযোগ করা হলে তাকে পাওয়া যায়নি।

এই বিষয়ে গণপূর্ত অধিদপ্তরের প্রধান প্রকৌশলী এই প্রতিবেদককে জানিয়েছেন, “তদন্ত করে যদি সত্যতা পাওয়া যায় তাহলে অবশ্যই ব্যবস্থা নেওয়া হবে।”

এই বিষয়ে গৃহায়ণ ও গণপূর্ত মন্ত্রণালয়ের মন্ত্রী জাকারিয়া তাহের এ প্রতিবেদককে জানিয়েছেন, “কোন কর্মকর্তা যদি কোন দুর্নীতিতে যুক্ত থাকে তাহলে কোন ছাড় দেওয়া হবে না। আমি এই মন্ত্রনালয়ের দায়িত্বে থাকা অবস্থায় কোন দুর্নীতি হবে না।”

নিউজটি শেয়ার করুন

আপনার মন্তব্য

Your email address will not be published. Required fields are marked *

আপনার ইমেইল এবং অন্যান্য তথ্য সংরক্ষন করুন

আপলোডকারীর তথ্য

টেন্ডার কারসাজি ও কমিশন সিন্ডিকেট

গণপূর্তের প্রকৌশলী শামছুদ্দোহার ‘ঘুষ রাজত্ব’

আপডেট সময় : ০১:১৬:২০ পূর্বাহ্ন, সোমবার, ২৫ মে ২০২৬

গণপূর্ত অধিদপ্তরের অতিরিক্ত প্রধান প্রকৌশলী মো. শামছুদ্দোহা পিআরএল (অবসরোত্তর ছুটি)-কে সামনে রেখে বেপরোয়া হয়ে উঠেছেন। তাঁর বিরুদ্ধে ব্যাপক আর্থিক অনিয়ম, কমিশন বাণিজ্য ও টেন্ডার কারসাজির অভিযোগ উঠেছে।

দীর্ঘদিন ধরে তিনি একটি শক্তিশালী সিন্ডিকেট গড়ে তুলে অধিদপ্তরের বিভিন্ন উন্নয়ন প্রকল্পে একচ্ছত্র প্রভাব বিস্তার করে আসছেন।

অধিদপ্তরের একাধিক সূত্র জানায়, বিসিএস পাবলিক ওয়ার্কস ইঞ্জিনিয়ার্স অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি হওয়ায় তাঁর বিরুদ্ধে সাধারণ কর্মকর্তা-কর্মচারীরা প্রকাশ্যে কথা বলতেও সাহস পান না।

অভিযোগ রয়েছে, তাঁর নেতৃত্বে গড়ে ওঠা সিন্ডিকেটের মাধ্যমে বিভিন্ন প্রকল্পের টেন্ডার, বাজেট বণ্টন ও অনুমোদন প্রক্রিয়ায় অনিয়ম করে বিপুল পরিমাণ অর্থ হাতিয়ে নেওয়া হচ্ছে।

সূত্রগুলো বলছে, শামছুদ্দোহার ‘চাহিদামাফিক কমিশন’ না দিলে অনেক কর্মকর্তা গুরুত্বপূর্ণ কাজ বা প্রকল্প থেকে বঞ্চিত হন। এতে সাধারণ ও নিরীহ কর্মকর্তারা চরম চাপের মুখে রয়েছেন।

অভিযোগ রয়েছে, সাভার সার্কেলের তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলীর দায়িত্বে থাকাকালে বড় বড় সরকারি আবাসন প্রকল্পের দরপত্রে অনিয়ম সংঘটিত হয়। এছাড়া ময়মনসিংহ জোনে দায়িত্ব পালনকালে মডেল মসজিদ প্রকল্পসহ বিভিন্ন উন্নয়ন কাজের এপিপি (APP) বরাদ্দ ও প্রাক্কলন অনুমোদনে দুর্নীতির আশ্রয় নেওয়ার অভিযোগও উঠেছে। সংশ্লিষ্টদের দাবি, নির্দিষ্ট ঠিকাদার গোষ্ঠীকে সুবিধা দিতে এলটিএমের (LTM) পরিবর্তে ওটিএম (OTM) পদ্ধতিতে দরপত্র আহ্বান করে অনিয়ম করা হয়েছে। এর মাধ্যমে প্রতিযোগিতা সীমিত করে পছন্দের ঠিকাদারদের কাজ পাইয়ে দেওয়া হতো।

অনুসন্ধানে জানা যায়, দুর্নীতির মাধ্যমে অর্জিত অর্থে রাজধানীর গুলশান, বনানী, উত্তরা, মিরপুর, বসুন্ধরা ও বারিধারায় একাধিক ফ্ল্যাটের মালিক হয়েছেন শামছুদ্দোহা। এ ছাড়া জামালপুরের সরিষাবাড়ীতে তাঁর আলিশান বাড়ি ও রিসোর্ট নির্মাণের জন্য বিপুল পরিমাণ জমি রয়েছে বলেও জানা গেছে। অভিযোগ রয়েছে, দেশে অর্জিত অর্থের একটি অংশ বিদেশেও পাচার করে সেখানে নামে-বেনামে সম্পদ গড়ে তুলেছেন।

সংশ্লিষ্ট সূত্র মতে, ছাত্রজীবনে আনন্দ মোহন কলেজ ও বুয়েট ছাত্রলীগের রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত ছিলেন শামছুদ্দোহা। এ ছাড়া সাবেক প্রধান প্রকৌশলী হাফিজুর রহমান মুন্সীর আত্মীয় হওয়ায় দীর্ঘদিন ধরে তিনি গুরুত্বপূর্ণ পদে বহাল রয়েছেন। অভিযোগ রয়েছে, রাজনৈতিক প্রভাব ব্যবহার করে তিনি অতীতের বিভিন্ন অভিযোগ ধামাচাপা দিতে সক্ষম হন। সম্প্রতি প্রধান প্রকৌশলীর চলতি দায়িত্ব পেতে সরকারের উচ্চপর্যায়ে তদবির চালিয়েও ব্যর্থ হন তিনি।

এ ছাড়াও অধিদপ্তরের ভেতরে নারী কেলেঙ্কারিসহ নানা অনৈতিক কর্মকাণ্ড নিয়েও আলোচনা রয়েছে বলে দাবি করেছেন একাধিক কর্মকর্তা। তাঁর প্রভাবের কারণে অনেকেই প্রকাশ্যে মুখ খুলতে ভয় পান।

সাধারণ কর্মকর্তা-কর্মচারীদের দাবি, গণপূর্ত অধিদপ্তরে স্বচ্ছতা ফিরিয়ে আনতে শামছুদ্দোহার বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগগুলো দ্রুত তদন্ত করতে সংশ্লিষ্ট ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের আশু হস্তক্ষেপ প্রয়োজন।

এসব অভিযোগের বিষয়ে মুঠোফোনে গণপূর্ত অধিদপ্তরের অতিরিক্ত প্রধান প্রকৌশলী মো. শামছুদ্দোহা”র সঙ্গে মুঠোফোনে যোগাযোগ করা হলে তাকে পাওয়া যায়নি।

এই বিষয়ে গণপূর্ত অধিদপ্তরের প্রধান প্রকৌশলী এই প্রতিবেদককে জানিয়েছেন, “তদন্ত করে যদি সত্যতা পাওয়া যায় তাহলে অবশ্যই ব্যবস্থা নেওয়া হবে।”

এই বিষয়ে গৃহায়ণ ও গণপূর্ত মন্ত্রণালয়ের মন্ত্রী জাকারিয়া তাহের এ প্রতিবেদককে জানিয়েছেন, “কোন কর্মকর্তা যদি কোন দুর্নীতিতে যুক্ত থাকে তাহলে কোন ছাড় দেওয়া হবে না। আমি এই মন্ত্রনালয়ের দায়িত্বে থাকা অবস্থায় কোন দুর্নীতি হবে না।”