গণপূর্তে কে এই প্রকৌশলী নিয়াজ তানভীর আলম!
- আপডেট সময় : ০৬:৩৩:৪৭ পূর্বাহ্ন, সোমবার, ২ মার্চ ২০২৬ ১২ বার পড়া হয়েছে
সুযোগ পেলেই নিজেকে বদলানো সরকারি কর্মকর্তাদের যেন একটি নিয়মে পরিনত হয়েছে। যখন যে রাজনৈতিক দল ক্ষমতায় আসে এবং সরকার গঠন করে তখন তার হয়ে যায়,আর সেই সুযোগে অনিয়মকে নিয়মে পরিনত করাই হচ্ছে কিছু কর্মকর্তার আসল পরিচয়। বলছি গণপূর্ত অধিদপ্তরের ই/এম ৪ নির্বাহী প্রকৌশলী নিয়াজ তানভীর আলম এর কথা।
তিনি শত অনিয়ম দুর্নীতি ঘুষ প্রকল্পের অর্থ আত্মসাৎ করেও আছেন পর্দার আড়ালে রয়ে গেছেন এখনো।
সূত্রে জানা গেছে, গণপূর্ত বিভাগ ই/এম ৪ ঢাকার নির্বাহী প্রকৌশলী নিয়াজ তানভীর আলমের বিরুদ্ধে দুর্নীতি, সরকারি প্রকল্পের অর্থ আত্মসাৎ, আওয়ামীলীগ নেতাকে ভুয়া পিতা বানিয়ে প্রভাব খাটিয়ে অবৈধ অর্থে বিপুল পরিমাণ সম্পদ অর্জন সহ অভিযোগের পাহাড়, বিভিন্ন দপ্তরের জমা পড়েছে একাধিক অভিযোগ।
এ ছাড়া দাপ্তরিকভাবে কয়েকটি প্রকল্পে অনিয়ম দুর্নীতির তথ্য প্রমাণিত হয়েছে।
জানা গেছে, খুলনা সদরের ২৮ নম্বর ওয়ার্ডের মিয়াপাড়া নতুন রাস্তার তালুকদার আব্দুল খালেক ও আকতারুন নেছার ছেলে নিয়াজ তানভীর আলম।তিনি ২০০৯ সালে ছাত্রলীগের কোটায় ২৮ তম বিসিএস ক্যাডারে সহকারী প্রকৌশলী হিসেবে সালে গণপূর্ত অধিদপ্তরে যোগদান করেন। চাকরিতে যোগদানের পরেই আওয়ামী লীগের প্রভাব খাটিয়ে জড়িয়ে পড়েন অনিয়ম দুর্নীতিতে।
আরো জানা গেছে, প্রকৌশলী নিয়াজ তানভীর আলমের বিরুদ্ধে অভিযোগের তালিকায় রয়েছে। প্রকৌশলী নিয়াজ তানভীর আলমের বিরুদ্ধে থাকা অভিযোগের প্রথম তালিকায় রয়েছে খুলনার রামপাল মংলা আসনের সাবেক সংসদ সদস্য ও খুলনা সিটি কর্পোরেশনের সাবেক মেয়র আওয়ামীলীগ নেতা তালুকদার আব্দুল খালেকের নাম ও তার পিতার নাম একই হওয়ায় প্রচার করতেন তিনি খুলনা সিটি কর্পোরেশনের মেয়র তালুকদার আব্দুল খালেকের পুত্র, শুধুমাত্র দলীয় প্রভাব ও অনৈতিক সুবিধা হাসিলের জন্য নিজের প্রকৃত পিতৃ পরিচয় গোপন করে একজন রাজনৈতিক নেতাকে নিজের বাবা বানিয়ে ছিলেন।
সূত্রে জানা গেছে, ৪০৬ কোটি টাকা ব্যয়ে নির্মিত কেরানীগঞ্জে ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগার নির্মাণে ব্যাপক অনিয়ম দুর্নীতির দায় ২০১৭ গণপূর্ত অধিদপ্তর একটি তদন্ত কমিটি করে এবং সেই কমিটির তদন্তে ৩৭ জন প্রকৌশলীতে দোষী সাব্যস্ত করা হয় তার মধ্যে নিয়াজ তানভীর আলম ছিলেন অন্যতম। ২০১৯ সালে মতিঝিলের এজিবি কলোনি ও আজিমপুর সরকারি কলোনিতে ৬৮ টি লিফট স্থাপনার জন্য ঘুষের বিনিময়ে অযোগ্য প্রতিষ্ঠানকে কাজ দেওয়ার সুপারিশ করেছিলেন।
নাম প্রকাশ না করা শর্তে গণপূর্তের একজন প্রকৌশলী এ প্রতিবেদককে জানান, গণপূর্ত ই/এম ৩ এর নির্বাহী প্রকৌশলী থাকা অবস্থায় আজিমপুর সরকারি কলোনির ভিতরে কার পার্কিং শেড নির্মাণে ব্যাপক অনিয়ম দুর্নীতির অভিযোগ ওঠায় গণপূর্ত অধিদপ্তরের অতিরিক্ত প্রধান প্রকৌশলী (পওবিপ্র) মো. শফিকুল ইসলাম কে প্রধান করে একটি তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়েছিল এবং সেই তদন্ত প্রতিবেদনে নিয়াজ তানভীর আলম কে অভিযুক্ত করে প্রতিবেদন জমা দেওয়া হয়েছিল। কিন্তু ফাইলটি কি অবস্থায় আছে তা এখানো জানা যায়নি। টাকার বিনিময়ে হয়তো বন্ধ করে রেখেছেন তিনি।
তিনি আরো জানান, ২০০৯ সহকারী প্রকৌশলী হিসেবে যোগদান করে আওয়ামী লীগের পরিচয় ও প্রভাব খাটিয়ে উপবিভাগীয় প্রকৌশলী ও নির্বাহী প্রকৌশলী হিসেবে পদোন্নতি হাতিয়ে নেন মাত্র কয়েক বছরে। তা ছাড়া তিনি ই/এম ৩ থেকে বদলি হয়ে সচিবালয় দায়িত্বে আসেন এখানে এসেও তিনি অনিয়ম-দূর্নীতি করেন। সচিবালয়ে নিম্নমানের ইলেকট্রনিক্স পণ্য সামগ্রী সরবরাহ করেন, সচিবালয় আগুনের সূত্রপাত হলে তদন্ত কমিটির প্রতিবেদনে নিম্নমানের মালামালের কারণে আগুনের সূত্রপাত হয় এখানেও অভিযুক্ত হয়েছেন নিয়াজ তানভীর আলম।
নাম প্রকাশ না করা শর্তে আরেক প্রকৌশলী জানান, তিনি সবচেয়ে বেশি প্রভাব বিস্তার করেন বঙ্গভবনে উপবিভাগীয় প্রকৌশলী কর্মরত থাকা অবস্থায়। সে সময় ব্যাপক অনিয়ম দুর্নীতি করে বিভিন্ন প্রকল্প থেকে অনেক অর্থ আত্মসাৎ করেন। অর্থের বিনিময়ে অনেক যোগ্য প্রতিষ্ঠানকে বাদ দিয়ে অযোগ্য প্রতিষ্ঠানকে কাজ দিতেন।
তিনি আরো জানান, এই প্রকৌশলীর বিরুদ্ধে অনিয়ম ও দুর্নীতির কারণে একাধিক ঠিকাদার ও বৈষম্যের শিকার হয়ে তার বিরুদ্ধে অধিদপ্তরে কয়েকটি অভিযোগ জমা দেন। কিন্তু দীর্ঘদিন হয়ে গেছে সেগুলো এখনো কোন আলোর মুখ দেখেনি।
ঠিকাদাররা আরো জানান, বিগত আওয়ামী সরকারের আমলে বিএনপি জামায়াতের তকমা লাগিয়ে অনেক প্রকৌশলী ও ঠিকাদারকে হয়রানি হেনস্থা করেছেন এই প্রকৌশলী। তা ছাড়া গণপূর্ত অধিদপ্তরের সাবেক বিতর্কিত দুর্নীতিবাজ প্রধান প্রকৌশলী শামীম আখতারের ঘনিষ্ঠ সহযোগী ছিলেন। আওয়ামী লীগ সরকার আমলে একাধিক মন্ত্রী এমপির সঙ্গে ছিল ঘনিষ্ঠ সখ্যতা। আওয়ামী সরকারের আমলে গঠিত সিন্ডিকেটের অনেক সদস্য ইতিমধ্যে বিভিন্ন শাস্তির আওতায় পড়েছেন কিন্তু তিনি আছেন ধরাছোঁয়ার বাহিরে। ঢাকা মেডিকেলের বেশ কয়েকটি কাজেও ব্যাপক অনিয়ম-দূর্নীতি করেছেন। সাবেক গণপূর্তমন্ত্রী,সচিব, রাজনীতিবিদ প্রভাবশালী ঠিকাদারসহ তৎকালীন বিতর্কিত অনেকের ছিলেন আস্থাভাজন।
একাধিক অভিযোগ ও নানা বিতর্ক থাকার পরও তিনি আছেন পর্দার আড়ালে। টেন্ডার ও বদলি বাণিজ্যের অভিযোগ জন্য তার বিরুদ্ধে পাহাড় সমান অভিযোগ। দুর্নীতি দমন কমিশন দুদকের দায়ের হয়েছে একাধিক অভিযোগ কিন্তু অদৃশ্য কারণে আলোর মুখ দেখেনা।
ঘুষ দুর্নীতি অনিয়ম টেন্ডার বাণিজ্য প্রকল্পের অর্থ আত্মসাৎ করে ক্রয় করেছেন বিপুল পরিমাণ অবৈধ সম্পদ অভিযোগ আছে চাকরি জীবনের পূর্বে পরিবারে তেমন আর্থিক স্বচ্ছলতা ছিল না কিন্তু গণপূর্ত অধিদপ্তরে যোগদান করে অনিয়ম দুর্নীতি করে ইতিমধ্যে ক্রয় করেছেন একাধিক প্লট ফ্লাট বাড়ি গাড়ি।
গণপূর্ত অধিদপ্তরের বেশ কয়েকজন কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করে বলেন প্রকৌশলী নিয়াজ তানভীর আলম শুধুমাত্র অনৈতিক সুবিধা আদায়ের জন্য যে ব্যক্তি নিজের বাবাকে অস্বীকার করে অন্য ব্যক্তিকে বাবা বানিয়ে ফেলে তাহলে আগামীতে হয়তো বিএনপি সরকার গঠন করলেও সেখান থেকেও কাউকে বাবা বানিয়ে ফেলবে দুর্নীতি করার জন্য তার বিরুদ্ধে এখন পর্যন্ত যত অভিযোগ অনিয়ম দুর্নীতির তথ্য এসেছে কোনটি কার্যকর হয়নি অবৈধ অর্থ দিয়ে সবকিছু ম্যানেজ করে ফেলেন, তবে নিয়াজ তানভীর আলম এর মত দুর্নীতিবাজ ব্যক্তিকে দ্রুত শাস্তির আওতায় নিয়ে আসতে হবে এবং সেটা অন্যান্য প্রকৌশলীর জন্য শিক্ষনীয় হবে তাহলে আর কেউ দুর্নীতি করতে সাহস পাবে না।
প্রকৌশলীর পরিবারে বিলাসী জীবনযাপন: পরিবারের সদস্যদের চলাচলের জন্য স্ত্রী শাকিলা ইসলামের নামে একটি দামি গাড়ি ক্রয় করেছেন। খুলনা শহরে রয়েছে তার একাধিক বাড়ি ও বিপুল পরিমাণ জমি। রাজধানী ঢাকায় রয়েছে আরও একাধিক ফ্লাট-প্লট। তার ছেলে আহনাফ তানভীর ও মেয়ে আইজা তানভীরের নামে কয়েকটি বেসরকারি ব্যাংকে রয়েছে কোটি কোটি টাকা এফডিআর ও নগদ গচ্ছিত। আইনের চোখ ফাঁকি দেওয়ার জন্য অধিকাংশ সম্পদ তার পিতা তালুকদার আব্দুল খালেক, মাতা আখতারুন নেছা,স্ত্রী শাকিলা ইসলাম, ছেলে আহনাফ তানভীর, মেয়ে আইজা তানভীর শশুর, শাশুড়ি সহ আরো বিভিন্ন আত্মীয়-স্বজনের নামে বেনামে ক্রয় করেছেন বিপুল পরিমাণ সম্পত্তি।
নির্ভরযোগ্য সূত্রে জানা গেছে, বিলাসী জীবন যাপন করেন সরকারি নিয়ম অনুযায়ী একজন নির্বাহী প্রকৌশলী ৫ম গ্রেডের কর্মকর্তা সর্বসাকুল্যে আনুমানিক ৬০ হাজার টাকার মত বেতন পান অথচ তার মাসিক খরচ প্রায় কয়েক লাখ টাকা। তিনি রাজধানীর সেগুনবাগিচা ৫ কনকর্ড টাওয়ারে ৬/এ ফ্লাটটি ক্রয় করেছেন কয়েক কোটি টাকা দিয়ে, যদিও বাড়ির কেয়ারটেকারের সঙ্গে কথা বললে তিনি বলেন স্যার এখানে ভাড়া থাকেন মাসে প্রায় ৭০ হাজার টাকা ভাড়া দেন তবে তার কথাবার্তা সন্দেহজনক মনে হয়, ফ্ল্যাটটি তার নিজের না হলেও একজন নির্বাহী প্রকৌশলী কিভাবে মাসে ৭০ হাজার টাকা বাড়ি ভাড়া দিয়ে থাকেন?
এসব বিভিন্ন অভিযোগের বিষয়ে জানতে নির্বাহী প্রকৌশলী নিয়াজ তানভীর আলমের মুঠোফোনে যোগাযোগ করা হলে তাকে পাওয়া যায়নি।
এই বিষয়ে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক) এর একজন ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করে জানিয়েছেন বিগত সরকারের আমলে যারা দুর্নীতি অনিয়ম করে অবৈধ অর্থ উপার্জন করেছেন তাদের কাউকে ছাড় দেওয়া হবে না এবং অবৈধ সম্পদ অর্জনের তথ্যের জন্য স্ত্রী পুত্র কন্যা ও বিভিন্ন আত্মীয়-স্বজনের সম্পদের হিসাব যাচাই করে দেখা হবে।
এই বিষয়ে জানতে গণপূর্ত অধিদপ্তরের প্রধান প্রকৌশলী খালিকুজ্জামান এ প্রতিবেদককে জানিয়েছেন, আমি কয়েক মাস হয়েছে এখানে এসেছি। তদন্তে করে ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
এ বিষয়ে ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশ “টিআইবি”র নির্বাহী পরিচালক ড. ইফতেখারুজ্জামান এ প্রতিবেদককে জানিয়েছেন, বিগত সরকারের আমলে ব্যাপক অনিয়ম ও দুর্নীতি হয়েছে গণপূর্ত অধিদপ্তরে। এসব কাজে অধিদপ্তরের বিভিন্ন প্রকৌশলী জড়িত। এদের বিরুদ্ধে তদন্ত করে দ্রুত আইনি ব্যবস্থা নেওয়া জরুরি।









